রবিবার, ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ -|- ২৪শে ভাদ্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-শরৎকাল -|- ৫ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৬ হিজরি
hridoyechattogram.com - news@hridoyechattogram.com - www.facebook.com/hridoyechattogram/

সঙ্গীত জগতের মহাসাগরের প্রবাল গুণী শিল্পী, চট্টল গৌরব প্রবাল চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে- বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্

পৃথিবীতে এমন কতগুলো ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেন যাদের সৃষ্টিশীল কর্মগুণে ওরা মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে অনন্তকাল।
দেশের সঙ্গীতাকাশে এক উজ্জল নক্ষত্র, মহৎপ্রাণ কণ্ঠশিল্পী প্রবাল চৌধুরী। ৬০দশকের শুরু থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সঙ্গীত সাধনায় মগ্ন থেকে এদেশের সঙ্গীতভান্ডারকে করে গেছেন সমৃদ্ধ। ১৬ই অক্টোবর, ২০১৫, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অন্যতম শব্দসৈনিক দেশবরেণ্য এই কন্ঠশিল্পী স্টুডিওতে গান গাইতে গাইতে হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে চিরবিদায় নেন।

১৯৪৭ সালের ২৫ অগাস্ট চাঁটগা’র রাউজান থানার বিনাজুরী গ্রামে পিতা মনমোহন চৌধুরী ও মাতা লীলাবতী চৌধুরীর ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে শিশু, নাম প্রবাল চৌধুরী। শৈশব কৈশোর যৌবন কেটেছে চট্টগ্রামের সুজলা-সুফলা প্রকৃতির মাঝে।
১৯৬৬ সালে কদুক্ষী গার্লস স্কুলে প্রথম গান গেয়ে মানুষের মন জয় করেন সেই সুদর্শন যুবক। ইতিহাসের উত্তাল দিনগুলোতে ১৯৬৭সালে চট্টগ্রামে গণআন্দোলনে যোগ দেন এই সাহসী এই মানুষটা। পরে সংগ্রামী এই শিল্পী ১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতার ডাকে যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে। তার ভরাট কন্ঠের সেই গান – ভেবো না মা তোমার ছেলেরা বাহির হয়েছে পথে………..আজও অমলীন। যুদ্ধচলাকালীন বিভিন্ন সরণার্থী শিবিরে মুক্তির গান গেয়ে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন, নয়মাস সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছেন লালসবুজের পতাকা।

বাংলা আধুনিক গানের রাজপুত্র ১৯৭৪ সেলে দেশের প্রথম রঙ্গীন ছবি বাদশাতে সেই কালজয়ী গান – আরে ও প্রাণের রাজা তুমি যে আমার……. গেয়ে ব্যাপকপরিচিতি পান সুপারহিট প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে।
মঞ্চ, বেতার টিভি, চলচ্চিত্রে কোথায় নেই প্রবাল ??? একের পর এক ভরাটকন্ঠের প্রানের সুর আর বিহবলতায় জয় করেন কোটি কোটি দর্শক শ্রোতার হৃদয়। লোকে যদি মন্দ কয় সেতো নহে পরাজয়……….., প্রেমের ওই মেলাতে লুকোচুরি খেলাতে………., কোথায় যাবো বন্ধু বলো কোথায় আমার ঘর….., আমি ধন্য হয়েছি ওগো ধন্য………, এই জীবন তো একদিন চলতে চলে থেমে যাবে…….., যদি বলি তুমি যে আমার ঘরনী, অভিমান করোনা সোনার বরনী………., আমি মানুষের মত বাঁচতে চেয়েছি, এই কী আমার অপরাধ………, ইত্যাদি অসংখ্য অসাধারন গান তাকে জনপ্রয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দেয়, আজও মানুের মুখে মুখে ফেরে। তারপর ১৯৮৪সালে অগ্নিপরীক্ষা ছবির মাধ্যমে সঙ্গীতপরিচালক হিসেবে আত্নপ্রকাশ করেন তিনি। সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা, অন্তরঙ্গতা আর ব্যস্ততা এগিয়ে নিয়ে গেছে শুধু সামনের দিকে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন সঙ্গীতে। শুধু তিনি নন তার বোন উমা খান (পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিলেন) সঙ্গীতজগতে সমাদৃত।

আপোষহীন, সংগ্রামী, প্রতিভাধর এই অসাধারন কন্ঠশিল্পীর স্থান ক্ষনজন্মা কীর্তিমানদের সারিতে। নির্লোভ, বিনয়ী, পরোপকারী এই মানুষটির ছিলো সুবিশাল একটা মন, সাংগঠনিক দক্ষতাও বিস্ময়কর, সর্বস্তরের শিলপীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে, সর্বদা সচেষ্ট।

বড্ড অভিমানী ও প্রচারবিমুখ ছিলেন তিনি। মহান শব্দসৈনিক কিংবদন্তী শিল্পী সঙ্গীতে অসামান্য অবদান রাখা সত্তেও জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় কোন পদক না পাওয়া জাতির জন্য পরম দূর্ভাগ্যজনক। মরনোত্তোর হলেও এই গুনী শিল্পীকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করার দাবী আজ সবার। বুকের গহীন ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাসের সাথে প্রশ্ন বেরিয়ে আসে প্রবাল কী একেবারেই হারিয়ে গেছেন ??? প্রবাল হারিয়ে যাবার নয়। বরেণ্য এই শিল্পী বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয় সাগরে, মূল্যবান প্রবাল সদৃশ। শ্রদ্ধ্যাভরে স্মরন করি এই গুণীজনকে বারেবার, শতবার যুগ যুগ ধরে ।।